কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক অনন্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। উনার প্রতিভার আলোকে বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি অঙ্গন সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিলো। কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, কণ্ঠশিল্পী, চিত্রশিল্পীর সাথে সাথে দার্শনিক, সমাজ সংস্কারক, শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, সুরস্রষ্টা, ব্যকরণবিদ হিসেবেও সমানভাবে সমাজের সব প্রান্তে নজর কেড়েছেন। এক কথায় তিনি ছিলেন সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার।
কান খোলা রাখলেই রবীন্দ্র সঙ্গীত অন্তরে ঢুকে যায়। লাইব্রেরীতে চোখ খুললেই উনার বই চোখে পরে। চোখ বুজলেই উনার গল্পের চরিত্ররা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। মুখ খুললেই শুধু উনার কবিতায় বেরিয়ে আসে। এতোটাই ব্যাপ্তি উনার লেখায়।
যাইহোক উপরের প্রতিভা ছাড়াও আরো অনেক দিক আছে। যাতে আলোকপাত করলেই ভেসে আসবে গুরুদেবের নাম। বিজ্ঞাপন জগৎ থেকে শুরু বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামকরণের ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
প্রথম এশীয় হিসেবে ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পেলেন। 'গীতাঞ্জলী' কাব্যগ্রন্থের ইংরেজীতে অনুবাদ 'Song Offerings' এর জন্য বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মান পেলেন। সেই নোবেল প্রাইজের টাকায় বীরভূমে প্রতিষ্ঠা করলেন 'শান্তিনিকেতন' বিশ্ববিদ্যালয়। এই 'শান্তিনিকেতন' নামটিও গুরুদেবের মস্তিষ্কপ্রসূত। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বিশ্বভারতী’ নামকরণ থেকে বাড়িগুলোর নাম পূরবী, শ্যামলী, উত্তরায়ণও নিজের হাতে দেওয়া। শান্তিনিকেতনের অদূরে দরিদ্র মানুষের জন্য 'শ্রীনিকেতন' হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করেন।
গুরুদেব যে কালি দিয়ে মঁ ব্লাঁ ফাউন্টেন পেনে যাবতীয় লেখালিখি করতেন সেই কালির নাম দিলেন ‘সুলেখা’। ফাউন্টেন পেনকে ডাকলেন ‘ঝরণা কলম’ নামে।
১৯১৫ সালে গান্ধিজীকে ‘মহাত্মা’ নামে আখ্যায়িত করেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ। এই ‘কবিগুরু’ উপাধিটি দিয়েছিলেন সেই মহাত্মা। স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রণী সুভাষচন্দ্রকে ‘দেশনায়ক’ এবং জওহরলালকে ‘ঋতুরাজ’ নামে ডাকলেন। যে ডাক কালজয়ী হয়ে সকলের মনে গেঁথে গেলো।
সে সময় গুরুদেবের কাছে অনেকই আসতেন। তাদের ছেলেমেয়েদের নাম রেখে দেবার জন্য। বিখ্যাত শিক্ষাব্রতী হুমায়ুন কবীর ও তাঁর বিদুষী স্ত্রী শান্তি দেবী গুরুদেবের কাছে পৌঁছলেন ছেলের নামকরণের আর্জি নিয়ে। দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে ইংরেজি হরফে লিখলেন KAMAL। তাতে হিন্দুরা পড়বে ‘কমল’ ও মুসলিমরা ‘কামাল’। ছেলের নাম হল প্রবাহন কামাল কবীর।
একবার ভারতের অল ইন্ডিয়া রেডিওর কর্মকর্তারা বেতার সংস্থার নাম দেওয়ার জন্য কবির দ্বারস্থ হলেন। কবিগুরুও সুরেলা অর্থবহ নামটি রাখলেন ‘আকাশবাণী’।
গুরুদেব নিজের উৎসাহে ঐতিহাসিক সুশোভন সরকারের মেয়ের নাম রাখলেন ‘ক্ষিপ্রা'। নামটা ঠিক কেমন লাগায়, গুরুদেবের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই সামান্য বদলে শিপ্রা করে নিলেন। বেশ কয়েকদিন পর কবিগুরু শিশুটিকে নিজের দেওয়া নামে ডাকলেও কোনো সাড়া পেলেন না। সুশোভনবাবু লজ্জিত হয়ে সামান্য বদলে শিপ্রার কথা বললেন। অপূর্ব রসবোধে কবিগুরু বললেন “বেশ তো! ক্ষিপ্রা তো নদীর বর্ণনা, আর শিপ্রা তো নদীর নামই।” শিপ্রা সরকার পরবর্তীতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক হয়েছিলেন।
বিখ্যাত শিশু সাহিত্যিক সুকুমার রায়ের পুত্রের নাম রাখলেন সত্যজিৎ। পরবর্তীতে বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার হিসেবে এই উপমহাদেশের প্রথম ‘অস্কার’ বিজয়ী হয়েছিলেন।
কল্যাণমূলক অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব অবদানের জন্য ১৯৯৮ তে নোবেল জিতলেন অমর্ত্য সেন। গুরুদেব অমর্ত্যর মাকে এই অবিনশ্বর 'অমর্ত্য' নামটি সুপারিশ করেছিলেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ‘প্রিয়দর্শিনী’ নামটি কবিগুরুর দেওয়া। আর্জেন্টিনার ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে যিনি পেরু যাত্রার সময় অসুস্থ গুরুদেবের খুব সেবা করেছিলেন। পরবর্তীতে গুরুদেবকে চিত্র অঙ্কনে খুব উৎসাহিত করেছিলেন। গুরুদেব তাকে ‘বিজয়া’ নামে ডাকতেন।রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী শান্তিময়ের নাম পরিবর্তন করেছিলেন শান্তিদেব ঘোষে।
রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী ভবতারিণীকে পাল্টে দিলেন মৃণালিনী দেবীতে। নিজের পাঁচ সন্তানের নাম তিনি রেখেছিলেন রথীন্দ্রনাথ, শমীন্দ্রনাথ, মাধুরীলতা, রেণুকা আর মীরা। প্রিয় নাতনির ‘নন্দিনী’ নামও তাঁরই অর্পণ।
এলা, সুচরিতা, নিখিলেশ রবীন্দ্রনাথের রচনা থেকে কত মানুষ যে রেখেছেন তাঁর শিশুর নাম। যেমন চণ্ডালিকা নৃত্যনাট্যের প্রধান চরিত্র প্রকৃতির নামে মেয়ের নাম রাখেন রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী লাইসা আহমেদ লিসা।
'নাইট' উপাধি বর্জন থেকে 'একলা চলো রে' কবিগুরু বার বার স্বাধীনতা সংগ্রামে এগিয়ে এসেছেন। বিপ্লবী এবং নারী আন্দোলনের অগ্রদূত লীলা রায় ১৯৩১ সালে যখন একটি মহিলা মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করলেন। সেই মাসিক পত্রিকার নামকরণ ‘জয়শ্রী’ দিয়েছিলেন কবিগুরু।
বিজ্ঞানী, পরিসংখ্যানবিদ ও ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ কবিগুরুর খুব কাছের মানুষ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন সময়ে উনার বাড়িতে শশী ভিলাতে আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন। এই বাড়ির দক্ষিণ-পূর্ব দিকের ঘরটির নাম রেখেছিলেন 'নেত্রকোনা'।
সারা বিশ্বে এক মাত্র কবি যার গান দুটি ভিন্ন দেশে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে পালন করা হয়। ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশ। এই ‘বাংলাদেশ’ নামের বানানটিও গুরুদেবের থেকে নেওয়া।
গুরুদেবের প্রায় সব সৃষ্টি আর্কাইভ করে রাখা গেলেও এমন সুন্দর সুন্দর ইতিহাস কালের অতলে চলে গেছে। বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তির আত্মকথন বা সাক্ষাৎকারে হইতো কিছু কিছু জানা গেছে। কিন্তু সেটাও সেই হিমশৈলের চূড়া মাত্র।
যদিও এমন মনীষীদের কখনো মৃত্যু হইনা। তবু এটা তো মানতেই হবে উনার নশ্বর দেহটি ১৩৪৮ সনের ২২শে শ্রাবণ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।
‘মৃত্যু দিয়ে যে প্রাণের
মূল্য দিতে হয়
সে প্রাণ অমৃতলোকে
মৃত্যুকে করে জয়।’
সেই মৃত্যুকে জয় করলেন বলেই আজও আমাদের প্রত্যেকের হৃদয়ে গুরুদেব অধিষ্ঠান করে আছেন। আমরা আজও গুরদেবের দর্শন পেতে ছুটে যায় জোড়াসাঁকো থেকে শান্তিনিকেতন। মনের রসদ হিসেবে উনার আজীবনের দানই যথেষ্ট আমাদের জীবিত আত্মাকে উনার অবিনশ্বর মহাত্মার সাথে মিলিয়ে যেতে। তাইতো আজকের দিনে অমৃতলোকে এই ঠাকুরের প্রতি রইলো লক্ষ কোটি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন।
রচনাকাল : ৬/৮/২০২০
© কিশলয় এবং সাগর রহমান কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।